আপডেটস
জাতির পিতা

বঙ্গবন্ধুশেখ মুজিবুর রহমান

ভাষার অধিকার থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা—বাঙালির দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর জীবন, ভাষণ, রচনা, সাক্ষাৎকার, রাষ্ট্রদর্শন ও শাসনকালকে এখানে মূল দলিল এবং ঐতিহাসিক মূল্যায়নের আলোয় উপস্থাপন করা হয়েছে।

জীবন · সংগ্রাম · স্বাধীনতা · রাষ্ট্রনির্মাণ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারি প্রতিকৃতি
১৭ মার্চ ১৯২০ — ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
৭ মার্চ ১৯৭১ · রেসকোর্স ময়দান “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
Chapter 01

বঙ্গবন্ধু থেকে বাংলাদেশ | মহানায়কের জীবনরেখা

বঙ্গবন্ধুর শৈশব ও ছাত্ররাজনীতি থেকে রাজনৈতিক পথচলা, আন্দোলন-সংগ্রাম, ছয় দফা, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ৭ মার্চ, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা—গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলো এখানে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

শিকড় ও শৈশব

টুঙ্গিপাড়াগোপালগঞ্জ

১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম। গ্রামীণ সমাজ, পরিবার ও স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর জনসংযোগভিত্তিক রাজনৈতিক চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে।

ছাত্ররাজনীতি ও প্রথম নেতৃত্ব

ছাত্ররাজনীতিম্যাট্রিকুলেশন

রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তার সূত্রপাত ছাত্রজীবনেই। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সংগঠিত ছাত্ররাজনীতিতে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

  • ১৯৩৮সহপাঠী আবদুল মালেকের প্রতি অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং তাঁকে উদ্ধার করতে গিয়ে সৃষ্ট সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মাত্র ১৮ বছর বয়সে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবার কারাগারে যান। তখন তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলের ছাত্র ছিলেন। সাত দিন কারাবন্দী থাকার পর আপস-মীমাংসায় মামলা প্রত্যাহার হলে তিনি মুক্তি পান। এটি তাঁর প্রথম কারাবরণ হলেও কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে ছিল না।
  • ১৯৩৯গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে অধ্যয়নকালে বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসা অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ও মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর কাছে ছাত্রদের পক্ষে বিদ্যালয়ের ফাটলধরা ও বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়া ছাদ সংস্কারের দাবি তুলে ধরেন শেখ মুজিবুর রহমান।
  • ১৯৪০নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে বৃহত্তর পরিসরে সংগঠিত ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন।
  • ১৯৪২গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চোখের অসুস্থতা ও অস্ত্রোপচারের কারণে এর আগে তাঁর শিক্ষাজীবনে প্রায় চার বছরের বিরতি পড়েছিল। একই বছর কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন।
  • ১৯৪৩মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন এবং সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

ছাত্র নেতৃত্ব, স্নাতক ও ঢাকায় যাত্রা

ইসলামিয়া কলেজছাত্র সংসদঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

একই বছরে তাঁর কলকাতা-পর্ব শেষ হয় এবং ঢাকা-পর্ব শুরু হয়। দেশভাগের পর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটিই তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে—যে প্রশ্ন পরবর্তী তেইশ বছরের রাজনীতি নির্ধারণ করবে।

  • ১৯৪৬কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।এটিই তাঁর প্রথম নির্বাচিত সাংগঠনিক পদ।
  • ১৯৪৭ইসলামিয়া কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন।
  • আগস্ট ১৯৪৭ভারত বিভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
  • দেশভাগের পরঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। সরকারি কিছু কালানুক্রমে এটি ১৯৪৮ সালে দেখানো হলেও প্রামাণ্য রেফারেন্স অনুযায়ী ভর্তি হয় দেশভাগের পরপরই, ১৯৪৭ সালে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রলীগ

আইন বিভাগ৪ জানুয়ারিছাত্রলীগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই তিনি নিজের সংগঠন গড়েন এবং ভাষার দাবিতে আন্দোলনে নামেন।

  • ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮পূর্ব বাংলার শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ) প্রতিষ্ঠা করেন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র।
  • ১১ মার্চ ১৯৪৮উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় পরিষদের ডাকে ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় তিনি গ্রেপ্তার হন। এটি ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাঁর প্রথম রাজনৈতিক গ্রেপ্তার ও কারাবরণ।

বহিষ্কার ও আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম

যুগ্ম সম্পাদকঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৪৯ সাল তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেমে গেলেও অধিকার আদায়ের আন্দোলন ও জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তা আরও গভীর হয়।

  • ১৯৪৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে সমর্থন ও নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জরিমানা ও মুচলেকার শর্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁর ছাত্রত্ব বাতিল হয় এবং আইনশিক্ষা অসমাপ্ত থেকে যায়। ১৪ আগস্ট ২০১০ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তটিকে অগণতান্ত্রিক ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে প্রত্যাহার করে।
  • ২৩ জুন ১৯৪৯ঢাকার রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই শেখ মুজিব যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

ভাষা আন্দোলন ও কারাবন্দিত্ব

রাষ্ট্রভাষা বাংলাকারাবাস

ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে তিনি কারাবন্দি ছিলেন কিন্তু কারাগারের ভেতর থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ ও দিকনির্দেশনা বজায় রাখেন। এখান থেকেই কারাবাস তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নিয়মিত অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায়।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থেকে দলের প্রধান সংগঠক

সাধারণ সম্পাদক দলীয় সংগঠন

১৯৪৯ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার চার বছরের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান দলের প্রধান সাংগঠনিক দায়িত্বে উঠে আসেন। এর আগে ১৯৫২ সাল থেকে তিনি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

  • ৯ জুলাই ১৯৫৩ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দলকে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করা, কর্মীদের সংগঠিত করা এবং মুসলিম লীগবিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী করার প্রধান দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়।
  • ১৯৫৩–১৯৬৬ প্রায় ১৩ বছর তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার অধিকার ও স্বাধিকারের আন্দোলনে একটি শক্তিশালী গণভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। ১৯৬৬ সালে তিনি দলটির সভাপতি নির্বাচিত হন।

যুক্তফ্রন্ট: গণরায় ও ছাপ্পান্ন দিনের সরকার

গণরায় প্রথম মন্ত্রিত্ব ধারা ৯২(ক)

৩০৯ সদস্যের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টিতে জয়ী হয়। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন। কিন্তু বিপুল জনসমর্থনে গঠিত সরকারটি মাত্র ছাপ্পান্ন দিনের মাথায় কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপে বরখাস্ত হয়। এ ঘটনা পূর্ব বাংলায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আরও শক্তিশালী করে।

  • মার্চ ১৯৫৪ যুক্তফ্রন্টের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ আসন থেকে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্তফ্রন্টের ২২৩টি মুসলিম আসনের মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ একাই লাভ করে ১৪৩টি।
  • ৩ এপ্রিল ১৯৫৪ শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রাথমিক মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। এতে আওয়ামী মুসলিম লীগের কোনো প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় যুক্তফ্রন্টের ভেতরে অসন্তোষ ও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।
  • ১৫ মে ১৯৫৪ পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠিত হলে শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি, ঋণ, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন দপ্তরের দায়িত্ব লাভ করেন। মন্ত্রিসভার শপথের দিনই নারায়ণগঞ্জের আদমজী পাটকলে বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে; হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
  • ৩০ মে ১৯৫৪ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ভারত শাসন আইনের ৯২(ক) ধারা প্রয়োগ করে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করেন এবং পূর্ব বাংলায় গভর্নরের শাসন জারি করেন। করাচি থেকে ঢাকায় ফেরার পর বিমানবন্দরেই শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর প্রায় দুই সপ্তাহের প্রথম মন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে।

আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ

তৃতীয় কাউন্সিল নাম পরিবর্তন অসাম্প্রদায়িকতা

এটি নিছক নাম বদল ছিল না। ছিল ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে দলটিকে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত করার আদর্শিক সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তটি আকস্মিকও ছিল না, কাউন্সিলের অনেক আগে থেকেই মওলানা ভাসানী দলের নাম থেকে ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলার পক্ষে ছিলেন। ১৯৫৫-তে সেই দাবিই গৃহীত হয়।

  • ২১–২৩ অক্টোবর ১৯৫৫ ঢাকার সদরঘাটে রূপমহল সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের তৃতীয় জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিলেই দলের নাম থেকে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
  • নতুন পরিচয় দলের নতুন আনুষ্ঠানিক নাম হয় “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ”। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার জন্য দলে যোগদানের পথ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হয়।
  • নেতৃত্ব কাউন্সিলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দলটিকে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে রূপ দেওয়ার কাজ অব্যাহত রাখেন।
  • ১৯৫৫ একই বছর শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগে মতপার্থক্য ও ভাসানীর প্রস্থান

কাগমারীপররাষ্ট্রনীতিNAP

আওয়ামী লীগের ভেতরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পশ্চিমা জোটমুখী পররাষ্ট্রনীতি এবং মওলানা ভাসানীর জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ও অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির মধ্যে মতপার্থক্য তীব্র হয়। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলন সেই দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে আনে।

  • ৬–১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭কাগমারী সম্মেলনে সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানীর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য প্রকাশ পায়।
  • ১৮ মার্চ ১৯৫৭মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
  • ২৪–২৫ জুলাই ১৯৫৭ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (NAP) গঠিত হয়।

গণতন্ত্রের অবসান, সামরিক শাসনের সূচনা

ইস্কান্দার মির্জা আইয়ুব খান সামরিক আইন

সামরিক আইন জারির মাধ্যমে পাকিস্তানে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ রুদ্ধ করা হয়। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ এবং বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে যে দমনমূলক শাসনের সূচনা হয়, তা পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে পরবর্তী সময়ে আরও তীব্র করে তোলে।

  • ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ বিলুপ্ত এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সামরিক আইন জারি করেন। সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়।
  • ১১ অক্টোবর ১৯৫৮ শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া হয়। প্রায় ১৪ মাস পর মুক্তি দেওয়া হলেও কারাফটকেই তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।
  • ২৭ অক্টোবর ১৯৫৮ আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। এর মাধ্যমে দেশটিতে সামরিক শাসন আরও সুসংহত হয়।

ছয় দফা: স্বায়ত্তশাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা

৫ ফেব্রুয়ারি ছয় দফা স্বায়ত্তশাসন

ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে প্রথমবারের মতো একটি সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামো দেয়। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটি বাঙালির “মুক্তির সনদ” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

  • ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনের বিষয়-নির্ধারণী কমিটির কাছে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করে তা সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ছয় দফা প্রকাশ্যে তুলে ধরেন।
  • ১৮–২০ মার্চ ১৯৬৬ ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ছয় দফা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়। একই কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
  • মার্চ–মে ১৯৬৬ ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তুলতে শেখ মুজিব দেশব্যাপী গণসংযোগ ও জনসভা শুরু করেন। এই সময় বিভিন্ন জেলায় তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার ও জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।
  • ৮ মে ১৯৬৬ ছয় দফা আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে চূড়ান্তভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর প্রায় তিন বছর তিনি কারাবন্দী থাকেন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে মুক্তি লাভ করেন।
  • ৭ জুন ১৯৬৬ শেখ মুজিবের মুক্তি ও ছয় দফার দাবিতে ডাকা হরতালে ঢাকা, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জে গুলিতে প্রাণহানি ঘটে। দিনটি পরে “ছয় দফা দিবস” হিসেবে পালিত হয়।

মামলা, অভ্যুত্থান এবং উপাধি

আগরতলা মামলা গণঅভ্যুত্থানবঙ্গবন্ধু

দীর্ঘ কারাবন্দিত্বের মধ্যে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ১ নম্বর আসামি করা হয়। মামলাটি তাঁকে বিচ্ছিন্ন করার বদলে তাঁর নেতৃত্বকে আরও বৃহত্তর গণআন্দোলনের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের চাপে মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং তিনি মুক্তি পান।

  • ১৮ জানুয়ারি ১৯৬৮কারাগারে আটক শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি করা হয়। তিনি ১ নম্বর আসামি ছিলেন।
  • ১৯ জুন ১৯৬৮আগরতলা মামলার বিচার শুরু হয়।
  • ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯গণঅভ্যুত্থানের মুখে পাকিস্তান সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে এবং শেখ মুজিব মুক্তি পান।
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আয়োজনে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ জনতার গণসংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” অভিধায় ভূষিত করা হয়। উপাধি প্রদানের ঘোষণা দেন তৎকালীন ডাকসু ভিপি ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক তোফায়েল আহমেদ। ওই সভার বক্তৃতায় তিনি ছাত্রদের এগারো দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।

নিরঙ্কুশ গণরায় ও ক্ষমতা হস্তান্তরের সংকট

সাধারণ নির্বাচন ছয় দফা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা

১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার পক্ষে পূর্ব বাংলার জনগণ অভূতপূর্ব রায় দেয়। আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সামরিক সরকার নির্বাচিত দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি।

  • ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়লাভ করে এবং সমগ্র পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
  • ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
  • নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার গঠনের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে থাকে।
  • ১ মার্চ ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলায় তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয় এবং শেখ মুজিবের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠে।
  • ৭ মার্চ ১৯৭১ উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন এবং বাঙালি জাতিকে মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন।

অসহযোগ থেকে স্বাধীনতা

অসহযোগ ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধ

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ব্যর্থ রাজনৈতিক আলোচনা, ২৫ মার্চের গণহত্যা এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা—ঘটনাপ্রবাহের এই দ্রুত পরিবর্তন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ দেয়।

  • ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলায় তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়।
  • ২–২৫ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন পরিচালিত হয়। এ সময় পূর্ব বাংলার বেসামরিক প্রশাসন কার্যত তাঁর নির্দেশ অনুসারে চলতে থাকে।
  • ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে অসহযোগের কর্মপন্থা, প্রতিরোধের প্রস্তুতি এবং মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্য একসূত্রে গাঁথা হয়। UNESCO স্বীকৃতি দেখুন →
  • ১৬–২৫ মার্চ ঢাকায় ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতাদের দফায় দফায় আলোচনা চলে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে কোনো সমঝোতা হয়নি। আলোচনার মধ্যেই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী অভিযানের প্রস্তুতি নিতে থাকে।
  • ২৫ মার্চ রাত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিকল্পিত গণহত্যা অভিযান শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়।
  • ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ঘোষণার বার্তা পাঠানোর পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। শুরু হয় নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ।
  • ১০–১৭ এপ্রিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠন করেন এবং মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ করেন। পাকিস্তানে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
  • মুক্তিযুদ্ধকাল শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী রেখে গোপন বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তাঁর মুক্তি ও নিরাপত্তার দাবিতে বিশ্বজুড়ে জনমত ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়।
  • ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। স্বাধীনতার সময়ও শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন

১০ জানুয়ারি সংসদীয় সরকার পুনর্গঠন সংবিধান

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রশাসন, অর্থনীতি ও অবকাঠামো পুনর্গঠন, শরণার্থী ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি একই বছর বাংলাদেশ একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান লাভ করে।

  • ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনে পৌঁছান। সেখান থেকে দিল্লি হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
  • ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। লাখো মানুষ তাঁকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানায়। রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন এবং অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
  • ১১–১২ জানুয়ারি ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু “অস্থায়ী সংবিধান আদেশ” জারি করে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। পরদিন তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হন।
  • জানুয়ারি–এপ্রিল স্বীকৃতির স্রোত: সোভিয়েত ইউনিয়ন ২৫ জানুয়ারি, যুক্তরাজ্য ২ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ৪ এপ্রিল। বছরের শেষ নাগাদ বিপুলসংখ্যক রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, যদিও চীনের ভেটোর কারণে জাতিসংঘের সদস্যপদ আটকে থাকে।
  • জানুয়ারি–মার্চ বেসামরিক প্রশাসন পুনর্গঠন, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ, শরণার্থী ও যুদ্ধাহত মানুষের পুনর্বাসন এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। মার্চের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।
  • ২৩ মার্চ “বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ” জারি হয়—সংবিধান রচনার প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ। ১৯৭০-৭১ সালে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই গণপরিষদের সদস্য হন।
  • ১০–১১ এপ্রিল বাংলাদেশের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়।
  • ৪ নভেম্বর গণপরিষদ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি হিসেবে ধারণ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান গ্রহণ করে।
  • ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্রের সংসদীয় শাসনব্যবস্থা, নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংবিধানিক কাঠামো আনুষ্ঠানিক ভিত্তি লাভ করে।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী: গঠনের প্রেক্ষাপট

জাতীয় মিলিশিয়া অস্ত্র উদ্ধার আইনশৃঙ্খলা

সিদ্ধান্তটি বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার আগেই নেওয়া হয়েছিল—১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে, বিজয়ের কয়েক দিনের মধ্যে। রক্ষীবাহিনী তাই আকস্মিক কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং যুদ্ধশেষে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা কাঠামো পুনর্গঠনের পরিকল্পনার অংশ। বাহিনীটির পরবর্তী কর্মকাণ্ড ও তা নিয়ে ওঠা অভিযোগ আলাদা প্রশ্ন—সেগুলো “বিতর্ক ও সমালোচনা” অধ্যায়ে রাখা হয়েছে।

  • ১৮–২৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে বৈঠকে ১১ সদস্যের “জাতীয় মিলিশিয়া” বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
  • ৩ জানুয়ারি ১৯৭২ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে সভাপতি করে জাতীয় মিলিশিয়ার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়।
  • ফেব্রুয়ারি–মার্চ ১৯৭২ এই পরিকল্পনা থেকেই জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠনের সরকারি আদেশ জারি হয়। এ. এন. এম. নূরুজ্জামান পরিচালক, সরোয়ার হোসেন মোল্লা উপপরিচালক (অপারেশন) ও আনোয়ার উল আলম উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) নিযুক্ত হন; সদর দপ্তর ঢাকার শেরেবাংলা নগরে। আদেশ জারির নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে উৎসভেদে ভিন্নতা আছে (৮ ফেব্রুয়ারি বনাম ৮ মার্চ)।
  • গঠনের কারণ · ০১ পুলিশ কাঠামোর পতন—সদস্য সংখ্যা অপ্রতুল, প্রশিক্ষণে বড় ঘাটতি, থানা ও অস্ত্রাগার লুণ্ঠিত। স্বাধীনতার পরও প্রায় ৫০–৬০টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা ও লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটে।
  • গঠনের কারণ · ০২ নয় মাসের যুদ্ধশেষে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বেসামরিক হাতে থেকে যায়; অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারই ছিল বাহিনীর ঘোষিত প্রধান দায়িত্ব।
  • গঠনের কারণ · ০৩ পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা তখনো ফেরেননি; সেনাবাহিনীর কাঠামো ও জনবল দুটোই অপূর্ণ ছিল।
  • গঠনের কারণ · ০৪ সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টিসহ কয়েকটি সশস্ত্র অতি-বাম গোষ্ঠী ১৯৭১ সাল থেকেই সক্রিয় ছিল; পাশাপাশি ছিল পরাজিত সহযোগী বাহিনীর ছত্রভঙ্গ সদস্যরা।
  • গঠনের কারণ · ০৫ মুজিব বাহিনী ও কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বাহিনীটির পত্তন হয়। অস্ত্র হাতে থাকা তরুণদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে আনাও এর একটি উদ্দেশ্য ছিল।
  • যে ব্যাখ্যা তারিখে টেকে না প্রচলিত একটি ভাষ্য হলো, জাসদ ও গণবাহিনী দমনের জন্য রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়েছিল। কালানুক্রম তা সমর্থন করে না। জাসদ গঠিত হয় ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর, গণবাহিনীর তৎপরতা তারও পরে। সংঘাতটি বাস্তব ছিল, কিন্তু তা গঠনের কারণ নয়, পরবর্তী পর্যায়ের ঘটনা।
  • ৪ অক্টোবর ১৯৭৫ “জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সামরিক বাহিনীতে আত্তীকরণ) অধ্যাদেশ” জারির মাধ্যমে বাহিনীটি বিলুপ্ত হয় এবং সদস্যদের সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণ করা হয়।

নির্বাচিত সরকার ও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ

প্রথম জাতীয় নির্বাচন আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন জুলিও-কুরি পদক জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন

সংবিধানের অধীনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার নতুন গণরায় লাভ করে। একই বছর মুক্তিযুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের আইনি ভিত্তি স্থাপন, পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচনা এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে।

  • ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা অব্যাহত রাখেন।
  • ২৩ মে বিশ্ব শান্তি পরিষদ শান্তি, স্বাধীনতা ও মানবতার পক্ষে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও-কুরি শান্তি পদক’ প্রদান করে।
  • ২০ জুলাই গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের বিচারের জন্য ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’ প্রণীত হয়।
  • সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন। এর মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বমঞ্চে আরও দৃশ্যমান হয়।
  • ২২ সেপ্টেম্বর সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা ঘোষণা, প্রতিরোধমূলক আটক এবং জরুরি অবস্থায় কয়েকটি মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান যুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে এসব বিধান নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়।
  • বছরের শেষভাগ যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠন, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩–১৯৭৮) প্রণীত হয়।

বিশ্বস্বীকৃতি ও গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট

পাকিস্তানের স্বীকৃতি জাতিসংঘ দুর্ভিক্ষ জরুরি অবস্থা

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করে এবং জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হিসেবে বিশ্বসভায় স্থান লাভ করে। অন্যদিকে বন্যা, খাদ্যবাজার ও বণ্টনব্যবস্থার দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক সহায়তার বিলম্ব এবং যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রাষ্ট্র পরিচালনাকে গভীর সংকটে ফেলে।

  • ৯ ফেব্রুয়ারি সশস্ত্র বিপ্লবী/উগ্র বামপন্থী সংগঠন, সরকারবিরোধী গুপ্ত দল, যুদ্ধোত্তর অবৈধ অস্ত্রধারী গোষ্ঠী এবং অপরাধী চক্র সহিংসতায় যুক্ত নাশকতামূলক কার্যক্রম প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪’ প্রণীত হয়। আইনটি সরকারকে প্রতিরোধমূলক আটক ও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের বিস্তৃত ক্ষমতা দেয়।
  • ২২–২৪ ফেব্রুয়ারি ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। পরদিন বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (OIC) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন এবং বাংলাদেশ ওআইসির সদস্যপদ লাভ করে।
  • ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে যুদ্ধবন্দি ও আটকে পড়া নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। চুক্তির অংশ হিসেবে অভিযুক্ত ১৯৫ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে ফেরত পাঠানো হয় এবং তাঁদের বিচার আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
  • ১৬ মে ১৯৭৪ নয়াদিল্লিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এতে সীমান্ত চিহ্নিতকরণ ও ছিটমহল বিনিময়ের কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ২৩ নভেম্বর ১৯৭৪ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে চুক্তিটি অনুমোদন করে। বাংলাদেশের দিক থেকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ছয় মাসেই সম্পন্ন হয়। ভারত অনুসমর্থন করে ৪১ বছর পর ২০১৫ সালে ( বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতা থাকাকালীন সময়ে) সংবিধানের ১০০তম সংশোধনীর মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয় ১ আগস্ট ২০১৫।
  • মার্চ–ডিসেম্বর দুর্ভিক্ষের সূচনা ধরা হয় ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে, আর তা স্তিমিত হয় সেই বছরেরই ডিসেম্বরের দিকে। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান সংকট জুলাই–আগস্টের ভয়াবহ বন্যার পর পূর্ণ দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়। খাদ্যবণ্টনের দুর্বলতা, মজুতদারি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং সহায়তা পৌঁছাতে বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে। সরকার ত্রাণ ও লঙ্গরখানা চালু করলেও ব্যাপক প্রাণহানি ও জনদুর্ভোগ এড়ানো যায়নি। মৃতের সংখ্যা নিয়ে হিসাব ব্যাপকভাবে ভিন্ন—সরকারি হিসাবে প্রায় ৪০ হাজার।
  • ১৭–২৫ সেপ্টেম্বর ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বাংলায় ঐতিহাসিক ভাষণ দেন এবং শান্তি, ন্যায়বিচার, দারিদ্র্যমুক্তি ও বিশ্বমানবতার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
  • ২৮ ডিসেম্বর দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। এর ফলে মৌলিক অধিকার প্রয়োগের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপিত হয়।

স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি

আন্তর্জাতিক সংস্থা কূটনৈতিক ফোরাম অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আদায় ছিল প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপ ছিল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে জায়গা করে নেওয়া। সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশ একে একে জাতিসংঘব্যবস্থা, কূটনৈতিক ফোরাম ও উন্নয়ন-অর্থায়নের প্রতিষ্ঠানগুলোতে যুক্ত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্য যা ছিল অস্বাভাবিক দ্রুত গতি।

স্বাধীনতার পর · INTERNATIONAL INTEGRATION

অন্তর্ভুক্তি ঘটেছিল একাধিক পথে—আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান। তাই সবকিছুকে এক করে শুধু “আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ” বলা হয়নি।

০১ · আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান
১৯৭২Commonwealth১৮ এপ্রিল — ৩৪তম সদস্য
১৯৭২WHO১৯ মে
১৯৭২UNCTAD২০ মে
১৯৭২ILO২২ জুন
১৯৭২UNESCO১৯ অক্টোবর
১৯৭২UNIDO২১ ডিসেম্বর
১৯৭৩UPU · ITU · ESCAPজাতিসংঘব্যবস্থার সদস্যপদ
১৯৭৩ICAO · WMO · FAOবিমান চলাচল, আবহাওয়া ও খাদ্য-সংক্রান্ত সংস্থা
১৯৭৪OIC২৩ ফেব্রুয়ারি — লাহোরে ২য় ইসলামিক সম্মেলন
১৯৭৪United Nations১৭ সেপ্টেম্বর — ১৩৬তম সদস্য
০২ · রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম
১৯৭৩Non-Aligned Movementআলজিয়ার্স শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও জোটনিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ
০৩ · অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান
১৯৭২IMF১৭ আগস্ট
১৯৭২World Bank (IBRD) + IDA১৭ আগস্ট
১৯৭৩GATTবহুপাক্ষিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা
১৯৭৪Islamic Development Bank১২ আগস্ট — প্রতিষ্ঠাতা সদস্য

একদলীয় ব্যবস্থা ও একটি অসমাপ্ত অধ্যায়

চতুর্থ সংশোধনী বাকশাল রাষ্ট্রপতি ১৫ আগস্ট

বছরের শুরুতে রাষ্ট্রকাঠামোয় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে, আর বছর শেষ হওয়ার আগেই সবকিছু সহিংসভাবে থেমে যায়। এই সাড়ে ছয় মাসের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে আজও গবেষণা ও রাজনৈতিক বিতর্ক চলমান। এখানে কেবল ঘটনাক্রম রাখা হলো; মূল দলিল ধরে বিশ্লেষণ “বিতর্ক ও সমালোচনা” অধ্যায়ে।

  • ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী গৃহীত হয়। সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার এবং বহুদলীয় ব্যবস্থার স্থলে একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়; সংসদের কতক ক্ষমতা খর্ব হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংকুচিত হয় এবং সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের এখতিয়ার হারায়। একই দিনে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
  • ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ চতুর্থ সংশোধনীর ১১৭-ক অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে জারি করা ধারাবাহিক আদেশে (এস.আর.ও ৮৮-এল থেকে ৯৩-এল) দেশে একটিমাত্র রাজনৈতিক দল থাকার বিধান কার্যকর হয় এবং জাতীয় দল “বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ” (বাকশাল) গঠিত হয়; চেয়ারম্যান হন বঙ্গবন্ধু। এর চার মাস আগে, ১৪ অক্টোবর ১৯৭৪-এ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ন্যাপ (মোজাফফর) ও সিপিবিকে নিয়ে ত্রিদলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়েছিল। ঘোষিত লক্ষ্য হিসেবে গঠনতন্ত্রে রাখা হয় দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ, কৃষি-ব্যবস্থার সংস্কার ও সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদ, এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ।
  • ৭ জুন ১৯৭৫ বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় (এস.আর.ও নং ১৯১-এল) জাতীয় দলের পূর্ণ গঠনতন্ত্র প্রকাশিত হয়। এতে দলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, সাতটি সাংগঠনিক কমিটি, সদস্যপদের শর্ত এবং পাঁচটি অঙ্গ-সংগঠনের কাঠামো নির্ধারিত হয়। গঠনতন্ত্রটি কোনো দলীয় কাউন্সিল গ্রহণ করেনি; রাষ্ট্রপতি ১১৭-ক অনুচ্ছেদের (৩) দফার ক্ষমতাবলে তা প্রণয়ন করেন।
  • জুলাই ১৯৭৫ জেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করে গভর্নর পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যবস্থাটি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
  • ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সামরিক ষড়যন্ত্রে ধানমন্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। দেশের বাইরে থাকায় দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যান।

সাঁইত্রিশ বছরের একটি রাজনৈতিক জীবন

১৯৩৮ থেকে ১৯৭৫—এই দীর্ঘ পথে সংগ্রাম ছিল নিত্যসঙ্গী এবং কারাবাস ছিল নিয়মিত অধ্যায়। জীবনের বড় একটি অংশ তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন, রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে না আসার কারণে।

তাঁর রাজনীতিকে ব্যক্তিগত উত্থানের গল্প হিসেবে পড়লে মূল বিষয়টি হারিয়ে যায়। এটি ছিল একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রের দাবিকে ধাপে ধাপে সংগঠিত করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া—যার ভেতর দিয়ে একটি ভূখণ্ড, একটি পতাকা ও একটি পরিচয় তৈরি হয়েছে।

  • 01 সংগঠক · ১৯৪৯–৬৬
  • 02 নেতৃত্বদানকারী · ১৯৬৬–৭১
  • 03 রাষ্ট্রনির্মাতা · ১৯৭১–৭৫
  • 04 নিহত রাষ্ট্রনায়ক · ১৯৭৫
৩৭বছরের রাজনৈতিক জীবন (১৯৩৮–১৯৭৫)
৪৬৮২দিন কারাবন্দি ছিলেন (~১৩ বছর)
১৯৭১স্বাধীনতা অর্জনের বছর